হযরত উমর (রা) ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ সাহাবিদের একজন এবং ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। তাঁর নাম ইতিহাসে সোনালী অক্ষরে লেখা আছে শুধু মুসলিম উম্মাহর জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য। ন্যায়পরায়ণতা, সাহস, দৃঢ়চেতা চরিত্র এবং প্রশাসনিক যোগ্যতার কারণে তাঁকে “ফারুক” উপাধিতে ভূষিত করা হয়, যার অর্থ হলো—সত্য ও মিথ্যার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্যকারী।
হযরত উমর (রা)-এর জন্ম খ্রিস্টাব্দ ৫৮৪ সালে মক্কায়। তিনি কুরাইশ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং বাল্যকাল থেকেই শারীরিকভাবে বলিষ্ঠ ও কর্মঠ ছিলেন। তরুণ বয়সে তিনি কুস্তি, ঘোড়দৌড় এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। তিনি ছিলেন শিক্ষিত এবং লিখতে পড়তে জানতেন—যা সেই যুগে খুবই বিরল ছিল।
প্রথম জীবনে উমর (রা) ইসলাম গ্রহণের কঠোর বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি মুসলমানদের ওপর নির্যাতন চালাতেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াত থামানোর জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতেন। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় একদিন তিনি বোন ফাতিমা (রা.)-এর কাছে গিয়ে কুরআনের আয়াত শুনে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। সেই মুহূর্ত থেকেই তাঁর অন্তরে পরিবর্তন আসে এবং তিনি ইসলামের প্রতি আন্তরিকভাবে আকৃষ্ট হন। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গিয়ে ঈমান গ্রহণ করেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণ মুসলিম সমাজে এক নতুন শক্তি সঞ্চার করে।
ইসলাম গ্রহণের পর উমর (রা) দৃঢ়চিত্তে দ্বীনের পথে নিজেকে উৎসর্গ করেন। তিনি প্রকাশ্যে নামাজ আদায় শুরু করেন এবং সাহসের সঙ্গে মুসলমানদের অধিকার রক্ষায় দাঁড়ান। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নিতেন। হযরত উমর (রা)-এর দৃঢ়তা ও সাহস মুসলমানদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে।
হযরত আবু বকর (রা.)-এর ইন্তেকালের পর ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে উমর (রা) মুসলমানদের দ্বিতীয় খলিফা নিযুক্ত হন। তাঁর খিলাফতের সময়কাল ছিল প্রায় দশ বছর, এবং এই সময়ে ইসলামী সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের বহু অঞ্চল মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে আসে।
উমর (রা) শুধু যুদ্ধজয়ের দিক দিয়েই নয়, প্রশাসনিক সংস্কারের জন্যও সুপরিচিত। তিনি দিওয়ান ব্যবস্থা চালু করেন, সেনাবাহিনী ও অর্থব্যবস্থার জন্য নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করেন। বিচার ব্যবস্থায় তিনি অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ ছিলেন এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ সরাসরি শুনতেন।
হযরত উমর (রা)-এর ন্যায়বিচারের অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। তিনি খলিফা হলেও সাধারণ পোশাক পরতেন এবং সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেন। একবার এক ব্যক্তি অভিযোগ করল যে, খলিফা বেশি জমি নিয়েছেন। উমর (রা) সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত করতে বলেন এবং সত্য প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর পক্ষে রায় দেন।
এছাড়া তিনি সবসময় খেয়াল রাখতেন যেন কোনো নাগরিক ক্ষুধার্ত না থাকে। দুর্ভিক্ষের সময় তিনি নিজ হাতে খাবার বিতরণ করতেন এবং বলতেন, “যতক্ষণ না আমার প্রজারা তৃপ্ত হবে, আমি তৃপ্ত হব না।”
৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে ফজরের নামাজ আদায়রত অবস্থায় এক মাগুসি দাস তাঁর ওপর আক্রমণ চালায়। এ আঘাতের কারণে কয়েকদিন পর তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব গভীরভাবে শোকাহত হয়।
হযরত উমর (রা) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর শাসনব্যবস্থা, ন্যায়পরায়ণতা এবং দীনদারিত্ব আজও অনুসরণীয়। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, ক্ষমতা ভোগের জন্য নয়, বরং মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য। তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে আজকের সমাজও সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারে।
আপনি আমাকে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারেন, যেমনঃ
Are you sure to start over?