দৈনন্দিন জীবনে আমরা বিভিন্ন ধরনের তথ্য ব্যবহার করে থাকি। বর্তমান যুগকে তথ্য প্রযুক্তির যুগ বলা হয়। তথ্য প্রযুক্তির যুগে বসবাস করে তথ্য জানা, তথ্য অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ এবং এর প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জন আমাদের সকলের জন্য অপরিহার্য। তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফলের একাধিক ব্যাখ্যা থাকার সম্ভাবনা যাচাই এবং একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর দক্ষতা অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ।

🧩তথ্য ও উপাত্ত (Information and Data)

তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ, শিক্ষক প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে তোমাদের উপস্থিতি/অনুপস্থিতির তালিকা রেকর্ড করেন এবং সংরক্ষণ করেন। প্রতি পরীক্ষা শেষে তোমাদের বিভিন্ন বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বর সংরক্ষণ করেন এবং এর উপর ভিত্তি করে তোমাদের দুর্বলতা চিহ্নিত করেন এবং তা দূরীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। অনেক সময় আমরা বাজারে গিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্রের বাজারদর সরাসরি জানতে পারি। তোমাদের মধ্যে অনেকেই মাঠে গিয়ে সরাসরি ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা দেখেছ। অনেকেই চিড়িয়াখানায় গিয়ে বিভিন্ন পশু- পাখি সম্পর্কে অনেক কিছুই জেনেছ। আবার দৈনিক পত্র-পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন ইত্যাদি মাধ্যম থেকেও আবহাওয়া, খেলাধুলা, বাজারদর, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য আমরা পেয়ে থাকি। উপাত্ত: তোমাদের জানা আছে, পরীক্ষায় বিভিন্ন বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর সংখ্যায় প্রদান করা হয়। তথ্যসমূহ যখন

সংখ্যা দ্বারা প্রকাশ ও উপস্থাপন করা হয়, তখন আমরা উপাত্ত পেয়ে থাকি।

যেমন, অহনার বয়স ১১ বছর এটি একটি তথ্য। কিন্তু ১১ সংখ্যাটি হলো উপাত্ত ।

🧩বিন্যস্ত ও অবিন্যস্ত উপাত্ত

তোমাদের শ্রেণিতে ৪০ জন শিক্ষার্থী আছে। তোমরা 'ক' ও 'খ' নামে ২টি দলে ভাগ হয়ে নিজেদের ওজন (কেজি) পরিমাপ করে খাতায় লেখো। ধরা যাক, 'ক' দলের সদস্যদের ওজন (কেজি) নিম্নরূপ:

একটি কাজের মাধ্যমে উপাত্ত সংগ্রহ, বিন্যস্তকরণ এবং স্তম্ভলেখ (Bar Diagram) অঙ্কন প্রক্রিয়াটি উপস্থাপন করা হলো :

🧩জন্ম মাসের ট্যালি

আমাদের জন্ম মাস খুঁজে বের করার জন্য নিচের ছকটি পূরণ করি :

‘ট্যালির মোট সংখ্যা' কে আমরা গণসংখ্যা বলতে পারি।

এখন আমরা প্রত্যেকে বোর্ডের জন্ম মাসের ছক/সারণি ব্যবহার করে একটি স্তম্ভলেখ অঙ্কন করি। স্তম্ভলেখ সম্পর্কে তোমরা পূর্বের শ্রেণিতে জেনেছ। এ লেখচিত্রের মাধ্যমে খুব সহজে বিভিন্ন উপকরণের উপাত্তের মধ্যে তুলনা করা যায়।

একই মাপের ছোট কাগজে নিজেদের নাম লিখে বা তোমাদের (স্ট্যাম্প সাইজ) ছবির মাধ্যমে মাস অনুযায়ী সাজিয়ে হার্ড পেপার অথবা পুরাতন ক্যালেন্ডারের পিছনের পৃষ্ঠায় নিচের নমুনাটির মতো স্তম্ভলেখ তৈরি করো।

স্তম্ভলেখের মাধ্যমে তথ্য উপস্থাপন তোমার ক্লাসের ৪০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিগত এক সপ্তাহে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর সারণি নিচে দেয়া হলো:

                                   🧩স্তম্ভলেখ

উপরের স্তম্ভলেখটিতে আনুভূমিক রেখা বরাবর সপ্তাহের ৫ দিনের নাম এবং উল্লম্বরেখা বরাবর ঐ দিনগুলোতে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা প্রদর্শন করা হয়েছে।

🧩গড় (Mean)

গড়, গণিতে ব্যবহৃত এমন একটি সংখ্যাকে বোঝায় যা সংখ্যার গোষ্ঠী বা ডাটা সেট এর সাধারণ প্রতিনিধিত্ব করে। কিছু রাশি একত্র করে তাদের সংখ্যা দ্বারা ভাগ করতে হয়। অর্থাৎ উপাত্তসমূহের সংখ্যাসূচক মানের সমষ্টিকে উপাত্তসমূহের মোট সংখ্যা দ্বারা ভাগ করতে হয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে গড়ের ব্যবহার অনেক দেখে বা শুনে থাকি। যেমন: আমাদের গড় মাথাপিছু আয়, ইলিশের বাৎসরিক গড় উৎপাদন, ক্রিকেট খেলায় একজন বোলারের ওভার প্রতি গড় উইকেট প্রাপ্তি, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের গড় উপস্থিতি ইত্যাদি।

ক) আমাদের উচ্চতার সাংখ্যিক মানের সমষ্টি.............

সেন্টিমিটার।

খ) আমাদের উচ্চতার গড়........... সেন্টিমিটার।

গাণিতিক গড় দেখে সংগৃহীত উপাত্তের বৈশিষ্ট্য সমন্ধে নেয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় বাস্তবতার সাথে মিলে না। বিষয়টি বোঝা যাচ্ছে না, তাই না? তাহলে চলো একটি গল্পের মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করি।

মনে করো, তোমরা কয়েক বন্ধু ও তাদের পরিবারের সবাই মিলে বনভোজনে যাবে ঠিক করেছ। বনভোজনে বিভিন্ন খেলার ব্যবস্থা থাকবে এবং বিজয়ীদের পুরস্কার দেয়া হবে। সেখানে পরিবারের যে সকল সদস্যের বয়স ২০ বছর বা তার বেশি তাদের জন্য খেলার ব্যবস্থা থাকবে। আর যাদের বয়স ২০ বছরের কম তাদের জন্য অন্য একটা খেলার ব্যবস্থা করা হবে। তুমি হিসাব করে দেখলে সব পরিবার মিলিয়ে ২০ বছরের কম বয়সী সদস্য আছে মোট ৯ জন। তাদের মধ্যে ৫ জনের বয়স ৩ বছর, ২ জনের বয়স ১২ বছর, ১ জনের বয়স ১৪ বছর এবং ১ জনের বয়স ১৯ বছর।

তাহলে, এই ৯ জনের গড় বয়স

= (৩+৩+৩+৩+৩+১২+১২+১৪+১৯)/৯

= ৭২/৯ = ৮ বছর

ধরা যাক, খেলা হিসেবে এই গড়ের ধারণা নিয়ে একটা কুইজ এর ব্যবস্থা করা হলো। আর কুইজের প্রশ্ন হলো ৮ বছর বয়স উপযোগী শিক্ষার্থীর মতো:

ক) ২৭ + ২১ + ১৫ = ?

খ) ২৬৩৯ - ৩০৫ = ?

গ) ৭৯ × ৬৩ = ?

ঘ) ২০ টাকার কয়টি নোট = ৫০০ টাকা?

কুইজের ফলাফল কী হবে বুঝতেই পারছ। ৩ বছর বয়সের শিশুরা এগুলো পারবেই না। আবার, ১২, ১৪ ও ১৯ বছর বয়সের যারা আছে তারা এমনিতেই সব পারবে। ফলে খেলায় মজাই পাবে না। এখানে গড় নির্ণয় ঠিক আছে কিন্তু এক্ষেত্রে তা ব্যবহার উপযোগী নয়। তাহলে আমরা বলতে পারি, গড়ের ধারণা থেকে বাস্তব অবস্থা সবসময় সঠিকভাবে বোঝা যায় না। উপাত্তসমূহকে মানের ক্রমানুসারে সাজালে মাঝখানের যে বা যারা অবস্থান করবে এবং যে সকল উপাত্ত সর্বাধিকবার থাকবে তাদের জানা অপরিহার্য।

 

🧩মধ্যক (Median)

মধ্যক হলো সংগৃহীত উপাত্তের মধ্যম মান। প্রদত্ত উপাত্তসমূহ মানের ক্রমানুসারে সাজালে যে মান উপাত্তগুলোকে সমান দুই ভাগে বিভক্ত করে সেই মানটিই হলো ঐ উপাত্তগুলোর মধ্যক। দৈনন্দিন জীবনের অনেক ক্ষেত্রে গড় নির্ণয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কার্যকর হয় না, সেক্ষেত্রে মধ্যক তুলনামূলক ভালো ভূমিকা রাখে। যেমন: বনভোজনে গিয়ে তোমরা যে কুইজটি খেলেছ, তোমাদের গড় বয়স পেয়েছ ৮ বছর। কিন্তু ৯ জনের বয়স ছোট থেকে বড় অর্থাৎ মানের ঊর্ধ্বক্রমে সাজালে সংখ্যাগুলো হবে - ৩, ৩, ৩, ৩, ৩, ১২, ১২, ১৪, ১৯। এখানে মাঝামাঝি যে আছে তার বয়স ৩ বছর। এই ৩ ই হচ্ছে সংখ্যাগুলোর মধ্যক। যদি ৩ বছর বয়সের শিশুর উপযোগী করে কুইজ বা খেলার প্রশ্ন করা হয়, তাহলে প্রশ্নটি ৮ বছর গড় হিসেবে করা প্রশ্নের চেয়ে তুলনামুলক ভালো হবে।

মধ্যকের ধারণা আরও ভালোভাবে বুঝার জন্য নিচের উদাহরণগুলো লক্ষ করি: